সারাদেশে নদী-খাল পুনরুদ্ধারের কাজ চললেও টাঙ্গাইল শহরের কাগমারা-বেড়াডোমা এলাকার একটি খাল ভরাট করে সড়ক ও ড্রেন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। কাজটি টাঙ্গাইল পৌরসভার অধীনে চলমান বলে জানা গেছে।

এ প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।

তবে পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী শামীম আল মামুন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, “ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করেই নির্মাণসামগ্রীর মান নিশ্চিত করা হচ্ছে।” তিনি আরও দাবি করেন, খালটি বর্তমান প্রকল্প শুরুর আগেই ভরাট করা হয়েছিল।

পৌরসভার ‘ইমপ্রুভমেন্ট অব রোড স্টার্টিং ফ্রম ওয়েস্ট নর্থ কর্নার অব বেড়াডোমা ব্রিজ-কাগমারা লৌহজং রিভার’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ৩৫০ মিটার সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। কাজটি করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমজিই-কেএসএ।

খাল ভরাটের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, খাল সংকুচিত বা বিলুপ্ত হলে শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আরও খারাপ হবে, ফলে জলাবদ্ধতা বাড়বে এবং পরিবেশের ক্ষতি হবে।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, খালটির প্রস্থ অনেক জায়গায় ৭০ থেকে ৮০ ফুট ছিল। এখন খালের এক পাশে সরু ড্রেন এবং অন্য পাশে ১২ ফুটের সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে, এতে খালের স্বাভাবিক রূপ হারিয়ে যাচ্ছে।

আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও খালটির একটি অংশ মাটি ফেলে ভরাট করা হয়েছিল। তখন ৪০ ফুট চওড়া খালের এক পাশে মাত্র ছয় ফুটের ড্রেন নির্মাণ করা হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা শাহ আলম ফকির ও আজিজুল কদর বাবু বলেন, কাগমারা-বেড়াডোমা খালটি একসময় এলাকার প্রধান পানি নিষ্কাশন পথ ছিল। বর্ষাকালে আশপাশের পানি এই খাল দিয়ে বের হয়ে যেত।

আরেক বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, খাল দখল ও ভরাটের কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই শহরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। পাশাপাশি খালে ময়লা-আবর্জনা জমে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ইটের খোয়ার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

শ্রমিক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, বিষয়টি ঠিকাদারকে জানানো হয়েছে।

তবে ঠিকাদার নুরুল আমীন বলেন, “সড়কের উপরের স্তরে তৃতীয় শ্রেণির খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে এবং এতে সড়কের মান ভালো হয়।”

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পরিবেশবিদ অধ্যাপক এস এম সাইফুল্লাহ বলেন, টাঙ্গাইল শহরে ছোট-বড় মিলিয়ে ২৭টি খাল রয়েছে। এর মধ্যে অনেক খাল ড্রেনে পরিণত হয়েছে, কয়েকটি হারিয়ে গেছে। খালগুলো রক্ষা ও পুনরুদ্ধার না করলে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত সমস্যা আরও বাড়বে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) টাঙ্গাইলের জরিপেও শহরের ১৮টি ওয়ার্ডে ২৭টি খালের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন গবেষণা কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র চন্দ বলেন, খাল রক্ষায় প্রশাসনকে একাধিকবার অবহিত করা হয়েছে। নদী, খাল, বিল ও জলাশয় সংরক্ষণে সরকারের নির্দেশনা এবং উচ্চ আদালতের দিকনির্দেশনাও রয়েছে।

এদিকে শহরের ঐতিহাসিক ভিক্টোরিয়া খাল, যা স্থানীয়ভাবে শ্যামা বাবুর খাল নামে পরিচিত, সেটিও অনেকাংশে ড্রেনে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ব্যাপারে টাঙ্গাইল পৌরসভার প্রশাসক সঞ্জয় কুমার মহন্ত বলেন, “খালের মধ্যে ড্রেন হয়েছে—এ বিষয়ে আমি জানি না।”

ড্রেনের পাশে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে রাস্তার কাজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “লোকজন পাঠিয়ে রাস্তার কাজের খোঁজখবর নেব। যদি অনিয়ম হয় তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) টাঙ্গাইল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক তরুণ ইউসুফ বলেন, খাল শুধু শহরের সৌন্দর্যই বাড়ায় না, জলাবদ্ধতা কমাতেও ভূমিকা রাখে। তাই খাল ভরাটের বিষয়টি সরকারকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

এদিকে টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন উদ্দিন বলেন, জেলার বিভিন্ন খালের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে খাল পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করা হবে।