অথচ এই রূপকথার জন্মই হতো না, যদি না নিয়তি আর ভূরাজনীতি এক মোহনায় এসে মিলত। সেবার এশিয়া, আফ্রিকা ও ওশেনিয়া—এই তিন মহাদেশের জন্য বিশ্বকাপের টিকিট ছিল মাত্র একটি। বর্ণবাদের অভিযোগে তখন দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিষিদ্ধ করেছিল ফিফা।

অন্যদিকে আফ্রিকার দলগুলোর জন্য সরাসরি কোনো জায়গা না রাখায় ক্ষুব্ধ হয়ে বাছাইপর্ব থেকে সরে দাঁড়ায় আফ্রিকার ১৫টি দেশ। পরে দক্ষিণ কোরিয়াও নানা কারণে নাম প্রত্যাহার করলে উত্তর কোরিয়ার সামনে বাধা হয়ে থাকে শুধু অস্ট্রেলিয়া।

দুই লেগের সেই লড়াইয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ৯-২ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেয় রহস্যঘেরা দেশটি।

তবে ইংল্যান্ডে যাওয়ার আগেই নতুন বাধা আসে। সমাজতান্ত্রিক কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হওয়ায় উত্তর কোরিয়ার ফুটবলারদের ভিসা দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে ব্রিটিশ প্রশাসনে শুরু হয় টানাপোড়েন। শেষ পর্যন্ত অনুমতি মেলে। দলটি এসে পৌঁছায় ইংল্যান্ডের মিডলসবরো শহরে। আয়রেসাম পার্কে হওয়ার কথা ছিল তাদের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো।

ইংল্যান্ডের মানুষ দলটিকে উষ্ণ অভ্যর্থনাই জানিয়েছিল। কিন্তু প্রথম ম্যাচে সোভিয়েত ইউনিয়নের লম্বা-চওড়া ফুটবলারদের বিপক্ষে গড় উচ্চতায় অনেক খাটো কোরিয়ানরা ৩-০ গোলে হেরে গেলে গ্যালারিতে তাদের প্রতি সহানুভূতি আরও বাড়ে।

পরের ম্যাচে চিলির বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের গোলে ড্র করে কোনোমতে টিকে থাকে উত্তর কোরিয়া। শেষ ম্যাচে ইতালিকে হারালেই কেবল কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা সম্ভব ছিল। আর সেটাই ছিল দেশ ছাড়ার আগে নেতা কিম ইল সুংয়ের নির্দেশ—অন্তত একটি বা দুটি ম্যাচ জিততে হবে।

সেই নির্দেশ পালন করেছিল দলটি। গোলরক্ষক লি চ্যান-মিয়ং সেদিন গোলপোস্টের নিচে প্রায় অদম্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তার ওপর তখন বদলি খেলোয়াড় নামানোর নিয়মও ছিল না। প্রথমার্ধে ইতালির অধিনায়ক চোট পেয়ে মাঠ ছাড়লে ১০ জনের দলে পরিণত হয় ইতালি।

আর সেই সুযোগে পাক দু-ইকের একমাত্র গোলে ইতিহাস গড়ে উত্তর কোরিয়া।

পিয়ংইয়ংয়ে তখন গভীর রাত। কিন্তু রেডিওর সামনে জেগে ছিল লাখো মানুষ। জয়ের খবর ছড়িয়ে পড়তেই মাঝরাতে রাস্তায় নেমে আসে জনতার ঢল। আনন্দ আর আবেগে ভেসে যায় পুরো দেশ।

কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালের মুখোমুখি হতে উত্তর কোরিয়াকে যেতে হয় লিভারপুলে। কিন্তু আগাম হোটেল বুকিং না থাকায় তারা ওঠে ‘লয়োলা হল’ নামের একটি ধর্মীয় আশ্রমে। কাকতালীয়ভাবে সেখানে থাকার কথা ছিল ইতালির।

কমিউনিস্ট কোরিয়ান ফুটবলাররা দীর্ঘদিন একসঙ্গে ডরমিটরিতে থাকার অভ্যস্ত ছিল। কিন্তু সেখানে সবাইকে আলাদা কক্ষে রাখা হয়। ঘরের দেয়ালে ঝোলানো খ্রিষ্টীয় প্রতীক ও যিশুর ছবি দেখে অস্বস্তিতে পড়ে তারা।

পরে ২০০২ সালের তথ্যচিত্র দ্য গেম অব দেয়ার লাইভস-এ পাক দু-ইক বলেছিলেন, “আমরা আগে কখনো এমন কিছু দেখিনি। যিশুর মূর্তিতে পেরেক ঠোকা হাত দেখে ভয় পেয়েছিলাম। সেদিন রাতে কেউ ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি।”

তবে পরদিন গুডিসন পার্কে মাঠে নেমে ক্লান্তির কোনো ছাপ দেখা যায়নি। কারণ, মিডলসবরো থেকে প্রায় তিন হাজার ইংরেজ সমর্থক লিভারপুলে ছুটে এসেছিলেন উত্তর কোরিয়াকে সমর্থন দিতে।

গ্যালারির সমর্থনে উজ্জীবিত হয়ে ম্যাচের প্রথম ২৫ মিনিটেই পর্তুগালের বিপক্ষে ৩-০ গোলে এগিয়ে যায় উত্তর কোরিয়া। পুরো ফুটবল বিশ্ব আবারও বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়ে।

কিন্তু রূপকথারও শেষ আছে। পর্তুগালের কিংবদন্তি ইউসেবিও প্রথম গোল শোধ করার পর ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে কোরিয়ানদের স্বপ্ন। শেষ পর্যন্ত ৫-৩ গোলে হেরে বিদায় নেয় তারা।

এরপর দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর পশ্চিমা বিশ্ব উত্তর কোরিয়ার সেই দলটির কোনো খবরই পায়নি। একসময় গুজব ছড়ায়, ইতালিকে হারানোর পর অতিরিক্ত উদ্‌যাপনের কারণে নাকি পুরো দলকে শ্রমশিবিরে পাঠানো হয়েছিল।

তবে খেলোয়াড়েরা পরে সেই দাবি উড়িয়ে দেন। তাঁদের ভাষ্য, দেশে ফিরে তাঁরা কোনো শাস্তি পাননি; বরং জাতীয় বীর হিসেবে সংবর্ধনা পেয়েছিলেন।

আজও পিয়ংইয়ংয়ের ক্রীড়া পল্লির বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসে তাঁরা গর্ব নিয়ে স্মরণ করেন বিশ্বকাপের সেই অবিশ্বাস্য অভিযানের কথা।